কক্সবাজারের টেকনাফে অপহরণের তিন দিন পর ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে বাড়ি ফিরেছেন হ্নীলা বাজারের দর্জি দোকানি মোস্তাক আহমদ (৩১)। শনিবার রাতে বাহারছড়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার।
মোস্তাক আহমদ টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের পূর্ব পানখালী ৪ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার মৃত আব্দুস শুক্কুরের ছেলে। হ্নীলা বাজারে তাঁর একটি দর্জির দোকান রয়েছে।
মোস্তাকের স্ত্রী হোসনে আরা বেগম মুক্তিপণের টাকা পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, অপহরণকারীদের নির্দেশ অনুযায়ী মুক্তিপণের টাকা নিয়ে মোস্তাকের বোনজামাইকে বাহারছড়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় যেতে বলা হয়। পরে নির্দিষ্ট স্থানে ৫ লাখ টাকা রেখে আসার পর অপহরণকারীরা টাকা নিয়ে সেখান থেকে সরে যায়। এরপর অন্য একটি জায়গায় মোস্তাককে ছেড়ে দেওয়া হয়।
পরিবারের দাবি, অপহরণকারীদের হাতে মোস্তাক শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বর্তমানে তিনি কথা বলতে পারছেন না।
হোসনে আরা বেগম জানান, গত ৫ আগস্ট দুপুর ২টার দিকে হ্নীলা কাঁচাবাজার থেকে মোস্তাক নিখোঁজ হন। ওইদিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে পরিবারের কাছে একটি ফোন আসে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, মোস্তাককে অপহরণ করা হয়েছে। এরপর থেকে পরিবারের কাছে একের পর এক ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। কখনো ৫০ লাখ, আবার কখনো ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণে রাজি হয় অপহরণকারীরা।
অপহরণকারীদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডও পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।ওই ফোনালাপে হোসনে আরা বেগমকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে আমার স্বামীকে মারবেন না। আমি টাকা জোগাড় করে দিচ্ছি।
জবাবে অপহরণকারীরা হুমকি দিয়ে জানায়, ৫০ লাখ টাকা না দিলে মোস্তাককে হত্যা করা হবে। এমনকি তারা দাবি করে, মোস্তাককে হত্যার জন্য একজন তাদের ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছে।
এ সময় স্বামীকে বাঁচাতে হোসনে আরা বেগম বলেন, তিনি তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করছেন। একপর্যায়ে সন্তানদের কথা উল্লেখ করে স্বামীকে জীবিত ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অপহরণকারীদের কাছে আকুতি জানান তিনি।
পরে অপহরণকারীরা মোস্তাককে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়। তখন মোস্তাক দ্রুত টাকা জোগাড় করে দিতে স্ত্রীকে অনুরোধ করেন। তিনি জানান, তাঁকে হত্যার জন্য ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং টাকা না দিলে তাঁকে মেরে ফেলা হবে। স্বামীকে জীবিত ফিরে পেতে প্রয়োজনে গহনা বিক্রি করে হলেও টাকা জোগাড় করার কথা বলেন মোস্তাক।
এদিকে, বিষয়টি কাউকে জানালে মোস্তাককে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেয় অপহরণকারীরা। স্বামীকে বাঁচানোর আশায় হোসনে আরা বেগম বারবার অনুরোধ করেন, তিনি বিষয়টি কাউকে জানাবেন না।
শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার পর শনিবার রাতে বাহারছড়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় মোস্তাককে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিন দিনের উৎকণ্ঠা, ভয় ও অনিশ্চয়তার পর পরিবারের কাছে ফিরে আসেন তিনি।
এ বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, মোস্তাক নামে এক ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। তবে শনিবার তিনি অপহরণকারীদের কাছ থেকে ফিরে এসেছেন—এমন কোনো তথ্য তাঁর জানা নেই।
ওসি বলেন, মোস্তাককে কে বা কারা অপহরণ করেছে কি না, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, টেকনাফের পাহাড়কেন্দ্রিক এলাকায় গত এক বছরে অন্তত আড়াই শতাধিক মানুষ অপহরণের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছেন।