দেশের সর্বদক্ষিণের সীমান্ত শহর কক্সবাজারের টেকনাফে কাস্টমস কর্মকর্তা ও কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগের সদস্য পরিচয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা আদায় ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে জসিম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কখনো কাস্টমস কর্মকর্তা আবার কখনো কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগের সদস্য পরিচয়ে বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে টাকা দাবি করেন তিনি। তবে টেকনাফ স্থলবন্দর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জসিম নামে তাদের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত নেই। এ ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে কে এই জসিম? কাস্টমসের কেউ না হয়েও কীভাবে বছরের পর বছর সরকারি সংস্থার পরিচয় ব্যবহার করে চলেছেন তিনি?
জানা গেছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র টেকনাফ স্থলবন্দর। ১৯৯৫ সালে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য শুরু হওয়ার পর ২০০৩ সালের ৫ নভেম্বর এ বন্দর দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়। বন্দরকে ঘিরে টেকনাফে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটলেও কাস্টমসের পরিচয় ব্যবহার করে কথিতভাবে টাকা আদায়ের অভিযোগে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জসিম উদ্দিন প্রায়ই বিভিন্ন দোকানে গিয়ে নিজেকে কাস্টমস কর্মকর্তা বা গোয়েন্দা বিভাগের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। এরপর নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কাস্টমসের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
টেকনাফ পৌরসভার লামার বাজারের মেসার্স বিসমিল্লাহ স্টোর কসমেটিকসের দোকানি মো. আল আমিন অভিযোগ করেন, কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তা পরিচয়ে তার কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন জসিম উদ্দিন। তার দাবি, জসিমের ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠানোর পাশাপাশি নগদ টাকাও দিতে হয়েছে তাকে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে টেকনাফ পৌর শহরের হোটেল নিউ গার্ডেন গেস্ট হাউসের ২০৩ নম্বর কক্ষে মাসিক ভাড়ায় বসবাস করছেন জসিম। সেখানে তিনি কাস্টমসের লোক হিসেবে পরিচয় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
টেকনাফ প্রেসক্লাবের সদস্য সচিব সাইফুল ইসলাম সাইফী বলেন, জসিমকে দীর্ঘদিন ধরে টেকনাফ কাস্টমসের পরিচয়ে দেখা যাচ্ছে। তিনি কাস্টমসে আছেন কি না, গোয়েন্দা বিভাগে আছেন কি না কিংবা কোন সেক্টরে কাজ করেন এ বিষয়ে কারও কাছে সঠিক তথ্য নেই। কাস্টমস শুল্ক ও কাস্টমস গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখলে ভালো হয়।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে একটি আইডি কার্ড ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার তথ্যও রয়েছে। তিনি নিউ গার্ডেন হোটেলে ভাড়া নিয়ে থাকেন। তাকে নিয়ে অনেকের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।
হোটেল নিউ গার্ডেন গেস্ট হাউসের ম্যানেজার মো. ইয়াছিন বলেন, জসিম উদ্দিন কয়েক বছর ধরে কাস্টমসের লোক পরিচয়ে এখানে থাকেন। প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে রুম ভাড়া দেন।
কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জসিম উদ্দিনের সঙ্গে ডিবিসি নিউজের টেকনাফ প্রতিনিধি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমি কারও কাছ থেকে টাকা নিইনি। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বানোয়াট ভিত্তিহীন।
লামার বাজারের একটি দোকানের কর্মচারী জাহেদুল ইসলাম বলেন, জসিম এসে কাস্টমসে চাকরি করেন এমন পরিচয় দেন। তিনি দোকানে এসে চা খান। কাস্টমসের পরিচয়ে মাঝেমধ্যে আসেন। কীভাবে বা কেন আসেন, সেটা আমি জানি না। অন্য দোকান থেকে কাস্টমসের পরিচয়ে টাকা নিয়েছেন বলে শুনেছি, তবে আমার কাছ থেকে কোনো টাকা নিতে পারেননি।
তবে অভিযোগের বিষয়ে টেকনাফ স্থলবন্দর কাস্টমসের শুল্ক কর্মকর্তা মাহামুদুল রহমান বলেন, জসিম নামে কোনো ব্যক্তি টেকনাফ স্থলবন্দরের কাস্টমসে কর্মরত নেই। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্যের পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আরও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারি সংস্থার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে থাকলে তার পরিচয় যাচাই ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এদিকে জসিম উদ্দিন কাস্টমসের কর্মকর্তা বা কর্মচারী কি না, তার পরিচয় ও অভিযোগের সত্যতা যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানা গেছে। তদন্তে তিনি কাস্টমসের কেউ নন বলে প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা।
সূত্র ডিবিসি নিউজ।