শিরোনাম :
টেকনাফে কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ, জসিমকে চেনে না কাস্টমস, ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ সাবরাং ট্যুরিজম পার্কের সরকারি জমি দখল করে দোকান নির্মাণের অভিযোগ ছাত্রদল নেতা তারেক জামিলের বিরুদ্ধে টেকনাফে পূজা মন্ডপে কোন ধরনের ঝুঁকি নেই : রামু সেক্টর কমান্ডার মোঃ আনোয়ার উল আলম মিথ্যা অজুহাত দিয়ে দমদমিয়া জাহাজঘাট বন্ধ করেছে কতিপয় সিন্ডিকেট : মানববন্ধনে নেতারা ২২ দিনে ৭৮৩ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে শাহ পরীর দ্বীপে পৌঁছেছেন মাসফিকুল হাসান টনি মা ইলিশ রক্ষায় সাগরে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, বিপাকে জেলেরা সেন্টমার্টিনে খতনার পর ৫০ শিশু অসুস্থ, চিকিৎসায় টেকনাফের মেডিকেল টিম টেকনাফে এক সপ্তাহের ব্যবধানে মাল্টা-কমলার দাম ১৮০ থেকে ৬০০ টাকা,বিপাকে সাধারণ ক্রেতারা টেকনাফে ইউনুছ সিকদার হত্যা: ১০ মাসেও তদন্ত শেষ হয়নি, আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে টেকনাফে ব্যস্ত প্রধান সড়কে সন্ধ্যা নামলেই মাছ-তরকারির বাজার; দীর্ঘ যানজট, ভোগান্তিতে স্থানীয়রা

টেকনাফে ব্যস্ত প্রধান সড়কে সন্ধ্যা নামলেই মাছ-তরকারির বাজার; দীর্ঘ যানজট, ভোগান্তিতে স্থানীয়রা

টেকনাফ প্রতিনিধি / ৫১ বার পড়া হয়েছে
আপডেট সময় : রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩২ অপরাহ্ন

সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের প্রথম শ্রেণির পৌরসভার ঝর্ণা চত্বর এলাকায় সন্ধ্যা নামলেই ব্যস্ত প্রধান সড়ক পরিণত হচ্ছে অস্থায়ী মাছ ও কাঁচাবাজারে। সড়কের ওপর মাছ, তরকারি, ফলমূল, ভ্যানগাড়ি ও বিভিন্ন ধরনের খাবারের দোকান বসিয়ে চলছে বেচাকেনা। পাশাপাশি বাজার করতে এসে ইজিবাইক (মিনিটমটম) ও অন্যান্য যানবাহনও সড়কের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখায় সংকুচিত হয়ে পড়ছে যান চলাচলের জায়গা। এতে টেকনাফ-কক্সবাজার প্রধান সড়কের প্রায় ৪০০ মিটার অংশজুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট ও জনদুর্ভোগ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরে মাছ ও কাঁচা পণ্য বিক্রির জন্য একাধিক বাজার ও অস্থায়ী ব্যবস্থা থাকার পরও সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত ক্রেতার আশায় ব্যবসায়ীরা ঝর্ণা চত্বর এলাকায় প্রধান সড়কের ওপর বসছেন। উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও একই স্থানে বসছেন তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ঝর্ণা চত্বরের প্রধান সড়কের দুই পাশে মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। এমনকি ট্রাফিক পুলিশের বক্সের সামনেও বসানো হয় মাছের দোকান ও ভ্যানগাড়ি। কোথাও ভ্যানগাড়ি, কোথাও টেবিল কিংবা মাটির ওপর মাছ সাজিয়ে চলে বিক্রি। পাশাপাশি তরকারি, ফলমূল ও বিভিন্ন ধরনের খোলা খাবারের দোকানও বসে যায়।

বাজার বসার কারণে শুধু বিক্রেতারাই সড়ক দখল করেন না, ক্রেতাদের ইজিবাইক ও অন্যান্য যানবাহনও রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। অনেক চালক ও যাত্রী ইজিবাইক থামিয়ে মাছ, তরকারি ও অন্যান্য বাজার-সদাই করতে যান। ফলে একদিকে দোকানপাট ও ভ্যানগাড়ি, অন্যদিকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ইজিবাইকের কারণে প্রধান সড়কের চলাচলযোগ্য জায়গা আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। ট্রাফিক পুলিশের বক্সের সামনেই দোকান বসায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলের জায়গাও সংকুচিত হয়ে পড়ে বলে স্থানীয়রা জানান।

বিশেষ করে সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে দুই দিক থেকে বাস, সিএনজি, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যান চলাচল করায় যানজট তীব্র আকার ধারণ করে। অনেক সময় যানবাহনকে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। পথচারীদেরও বাধ্য হয়ে যানবাহনের ফাঁক দিয়ে রাস্তা পার হতে হয়। এতে যাত্রী ও পথচারীদের ভোগান্তির পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

স্থানীয়দের দাবি, এই বাজারের কারণে শুধু যানজটই নয়, প্রধান সড়কের স্বাভাবিক পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, যাত্রীবাহী বাস কিংবা পণ্যবাহী যান চলাচলেও বাধা তৈরি হচ্ছে।

 

শহরে বাজার থাকার পরও সড়কে কেন?

 

টেকনাফ পৌরসভা কার্যালয়ের সামনে বর্তমানে একটি অস্থায়ী মাছ বাজার রয়েছে। এছাড়া টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠের পাশেও মাছ বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে। পৌরসভার প্রধান সড়কসংলগ্ন হোটেল নিউ গ্রিন গার্ডেনের সামনেও রয়েছে অস্থায়ী মাছ বাজার। এসব ব্যবস্থা থাকার পরও সন্ধ্যার পর শহরের প্রধান স্টেশন ও ঝর্ণা চত্বর এলাকায় প্রধান সড়কের ওপর মাছের বাজার বসানো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্দিষ্ট বাজারে মাছ বিক্রি করলেও দিনের শেষে অনেক মাছ অবিক্রীত থেকে যায়। আবার স্টেশন থেকে কিছুটা দূরে হওয়ায় সন্ধ্যার পর ক্রেতা কমে যায়। ফলে অবশিষ্ট মাছ দ্রুত বিক্রির জন্য ঝর্ণা চত্বরে বসতে হয়।

মাছ ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বলেন, এখনো স্থায়ীভাবে কোনো মাছ বাজার নেই। হোটেল নিউ গার্ডেনের সামনে বাজারে অনেক সময় চাঁদা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমরা নির্দিষ্ট বাজারেই বসি। সন্ধ্যায় কিছু মাছ থেকে গেলে সেগুলো ঝর্ণা চত্বরে বিক্রি করি। স্টেশন থেকে একটু দূরে হওয়ায় মানুষ সহজে সেখানে যেতে চায় না। মাছ ব্যবসায়ীদের স্বার্থে স্থায়ী বাজার করে দেওয়া হলে আমাদের আর কোথাও বসতে হবে না।’

আরেক মাছ ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘বাজারে ক্রেতাদের চাহিদার তুলনায় অনেক সময় বেশি মাছ আসে। ফলে কিছু মাছ অবিক্রীত থেকে যায়। সন্ধ্যার পর ক্রেতা কম থাকায় অবশিষ্ট মাছ ঝর্ণা চত্বরে এনে বিক্রি করতে হয়। জায়গা সংকীর্ণ হওয়ায় সড়কের ওপর বসতে হয়।’

টেকনাফ বাস স্টেশন কাঁচা বাজার ক্ষুদ্র সমবায় সমিতির সহ-সভাপতি রফিক উল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিন বাস স্টেশন এলাকায় অবৈধভাবে দোকান বসানো হয়েছিল। পরে সরকার সেগুলো উচ্ছেদ করে। এরপর অনেক টাকা খরচ করে বর্তমান বাজারের জায়গা ভাড়া নেওয়া হয়েছে। তবে জায়গাটি স্থায়ীভাবে বাজার হিসেবে নির্ধারিত না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

টেকনাফ পৌরসভার বাসিন্দা আনোয়ার সাদেক বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে প্রধান সড়কের ওপর মাছ বাজার দেখছি। তাদের কয়েকবার উচ্ছেদ করা হলেও কিছুদিন পর আবার একই জায়গায় বসে। এতে যানজটের পাশাপাশি পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। এর একটি স্থায়ী সমাধান হওয়া জরুরি।’

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, ‘সন্ধ্যার পর এই সড়ক দিয়ে চলাচল করাই কঠিন হয়ে যায়। মাছের দোকানের সামনে ইজিবাইক থামিয়ে চালক ও যাত্রীরা বাজার করেন। ফলে রাস্তার দুই পাশ দখল হয়ে মাঝখানে যানবাহন চলাচলের জায়গা থাকে খুবই কম। একসঙ্গে দুই দিক থেকে গাড়ি এলে যানজট লেগে যায়। ব্যবসায়ীদেরও ব্যবসা করার অধিকার আছে, কিন্তু মানুষের চলাচলের প্রধান সড়ক দখল করে ব্যবসা করলে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।’

 

ময়লা-আবর্জনায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

 

সড়কের ওপর মাছ কাটাকাটি ও বেচাকেনার পর মাছের আঁশ, উচ্ছিষ্ট, পচা মাছ, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে রাখা হচ্ছে। এতে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি মাছি ও জীবাণুর বিস্তার ঘটছে। বৃষ্টির সময় এসব বর্জ্য পানির সঙ্গে মিশে সড়কের পাশে ছড়িয়ে পড়ায় পরিবেশ আরও নোংরা হয়ে ওঠে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা না থাকায় সন্ধ্যার বাজার শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘসময় সড়কের পাশে মাছের বর্জ্য পড়ে থাকে। এতে পথচারী, ব্যবসায়ী ও আশপাশের বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া খোলা অবস্থায় খাবার, ফলমূল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য বিক্রি করায় ধুলাবালি, যানবাহনের ধোঁয়া ও মাছের বর্জ্যের সংস্পর্শে এসব খাদ্যদ্রব্য দূষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

বারবার উচ্ছেদ, তবুও ফিরে আসে বাজার

 

স্থানীয়রা জানান, উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে সড়কের ওপর বসা দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে ঝর্ণা চত্বর।

তাদের মতে, শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাছ ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট ও স্থায়ী বাজারের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রধান সড়কে দোকান বসানো ও যানবাহন দাঁড় করিয়ে বেচাকেনা বন্ধে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনিক চৌধুরী বলেন, ‘সড়কের ওপর যারা মাছ বিক্রি করছিলেন, তাদের আমরা নির্ধারিত বাজারে নিয়ে গিয়েছি। এরপরও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বাজার থেকে বেরিয়ে আবার সড়কের ওপর বসছেন। পুরো বিষয়টি গুছিয়ে নিতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। এ জন্য গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাদের সাত দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের পরও আদেশ অমান্য করে সড়কে বসলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্থানীয়দের মতে, টেকনাফ শহরের অন্যতম ব্যস্ত এই সড়কটি কক্সবাজারের সঙ্গে উপজেলার যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই সড়কের ওপর নিয়মিত বাজার বসা শুধু যানজটের সমস্যা নয়; এটি জননিরাপত্তা, পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি করছে। ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট ও স্থায়ী বাজার নিশ্চিত করে প্রধান সড়কটি দখলমুক্ত রাখা গেলে একদিকে ব্যবসায়ীদের জীবিকার পথ যেমন স্বাভাবিক থাকবে, অন্যদিকে পথচারী ও যানবাহনের নির্বিঘ্ন চলাচলও নিশ্চিত হবে, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এজাতীয় আরো সংবাদ দেখুন
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!