কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা ভূমি অফিসে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ—সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড এবং কানুনগো—দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এতে ভূমি প্রশাসনের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ ভোগান্তি শিকার হচ্ছে।
উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ আগস্ট টেকনাফে দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার পর থেকেই পদটি শূন্য রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ছয় মাস ধরে কানুনগো পদও শূন্য। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্বে থাকা কানুনগো অবসরে যাওয়ার পর থেকে পদটিতে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় ভূমি অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জমির মালিকানা ও রেকর্ড হালনাগাদ,নামজারি-খারিজ, ভূমি উন্নয়ন কর, খাসজমি ব্যবস্থাপনা, সরকারি জমি রক্ষা, জমি নিয়ে বিরোধের শুনানি ও নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে এর প্রভাব পড়ছে।
বর্তমানে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস.এম. অনীক চৌধুরী। পাশাপাশি কানুনগোর অতিরিক্ত দায়িত্বও তিনি পালন করছেন। ফলে অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি ভূমি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজও সামলাতে হচ্ছে তাঁকে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি অফিসে নিয়মিত দায়িত্বশীল কর্মকর্তা না থাকায় বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে। বিশেষ করে নামজারি, জমির রেকর্ড সংশোধন ও ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তিতে সময় বেশি লাগছে। এর ফলে সেবা প্রত্যাশীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
ভূমি ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ নামজারি। জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার বা বৈধভাবে মালিকানা পরিবর্তনের পর নতুন মালিকের নাম রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। আবেদন যাচাই, মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন, আপত্তি থাকলে শুনানি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত—একাধিক ধাপের কারণে নামজারি প্রক্রিয়ায় দায়িত্বশীল কর্মকর্তার নিয়মিত উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া জমির মালিকানা, দখল, সীমানা বা খতিয়ান নিয়ে বিরোধের বিষয়েও ভূমি অফিসে নিয়মিত আসতে হয় স্থানীয়দের। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন হয় শুনানি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা না থাকায় এ ধরনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাসজমি ও সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনাও ভূমি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সরকারি জমি চিহ্নিতকরণ, রেকর্ড সংরক্ষণ, অবৈধ দখল প্রতিরোধ, দখলমুক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের ভূমি প্রশাসন সরাসরি যুক্ত। দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় এসব কার্যক্রমেও চাপ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এদিকে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় এবং জমির রেকর্ড-সংক্রান্ত জটিলতার সঙ্গেও এসিল্যান্ডের কার্যালয়ের কার্যক্রম জড়িত। ফলে কর্মকর্তা সংকটের প্রভাব শুধু সেবা প্রত্যাশীদের ওপর নয়, সরকারি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
টেকনাফের মতো সীমান্তবর্তী ও দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি উপজেলায় ভূমি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আরও বেশি।
স্থানীয়দের মতে, জমির মালিকানা, দখল, সরকারি সম্পত্তি, খাসজমি ও রেকর্ড-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশাসনিক নজরদারি দুর্বল হওয়ার সুযোগ নেই। তাই দ্রুত শূন্য পদে কর্মকর্তা নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন তারা।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস.এম. অনীক চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, বর্তমানে সার্ভেয়ারের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কানুনগোর কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে এবং তিনি নিজেই এসিল্যান্ডের দায়িত্ব দেখছেন।
তিনি আরও জানান, ভূমিসেবা কার্যক্রম আরও ত্বরান্বিত করতে শূন্য পদে কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টি বিভাগীয় কমিশনারকে জানানো হয়েছে। অতি শিগগিরই নতুন একজন সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদায়ন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত এসিল্যান্ড ও কানুনগো পদে কর্মকর্তা নিয়োগ হলে টেকনাফে ভূমি প্রশাসনের কার্যক্রমে গতি ফিরবে এবং দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবেন।